কম ঝুঁকিতে উচ্চ আয়ের বিনিয়োগ ক্ষেত্র

man finger about to press an analysis push button. Focus on the blue led. Concept image for illustration of risk management or assessment.

রক্ষণশীল বিনিয়োগকারীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ হতাশ হয়েছেন, কেননা স্বল্প হারের কারণে গ্যারান্টেড ইনস্ট্রুমেন্টগুলো থেকে প্রকৃতপক্ষে কোনো আয় আসছে না। সুদের হার যদিও বা বাড়ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে, সেই সুদের হার মুদ্রাস্ফীতিকে অতিক্রম করতে পারছে না, অর্থাৎ প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মকই থাকছে।

Image Source: 123rf.com

বিনিয়োজিত অর্থের ওপর মধ্যম পরিমাণের আয় চায় কিন্তু মূলধন খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় না এমন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি উভয়সংকট তৈরি করে। বেশ পরিমিত ঝুঁকির আমানতের সনদ ও ট্রেজারি সিকিউরিটিজ ছাড়াও কয়েকটি বিনিয়োগ বিকল্প রয়েছে যা উচ্চহারে সুদ দেয়। এই বিনিয়োগগুলো থেকে বিনিয়োগকারীর আয় বেশ ভালোভাবেই বাড়বে, অথচ সকালে তার মূলধন থাকবে কিনা সে দুশ্চিন্তায় তাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে না। বিনিয়োগকে শুধু নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে অনেকেই ভুল করে থাকেন। আজকের অজস্র বিনিয়োগকে এত সহজে শ্রেণীবদ্ধ করা যাবে না।

বিনিয়োগের ঝুঁকির কয়েকটি ধরন ও মাত্রা থাকতে পারে.

(ক) বাজার ঝুঁকি- বাজারে বিনিয়োগের মূল্যমান হারানোর ঝুঁকিকে বাজার ঝুঁকি বলে (প্রাথমিকভাবে ইকুইটিজ এবং মাধ্যমিকভাবে স্থির-আয়ের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।

(খ) সুদের হারের ঝুঁকি- সুদের হারের পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগের মূল্যমান হারানোর ঝুঁকিই হলো সুদের হারের ঝুঁকি (স্থির-আয়ের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।

(গ) পুনঃবিনিয়োগের ঝুঁকি- মেয়াদপূর্তিতে বিনিয়োগ কম সুদের হারে পুনঃবিনিয়োগ করা থেকে যে ঝুঁকির উৎপত্তি সেটিই হলো পুনঃবিনিয়োগের ঝুঁকি (স্থির-আয়ের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। 

(ঘ) রাজনৈতিক ঝুঁকি- দেশের রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে বিদেশি বিনিয়োগের মূল্যমান কমে যাওয়ার ঝুঁকিই হলো রাজনৈতিক ঝুঁকি (বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের হোল্ডিংগুলো এর দ্বারা প্রভাবিত) ।

(ঙ) আইন প্রণয়নজনিত ঝুঁকি- নতুন আইনপ্র ণয়নের কারণে বিনিয়োগের মূল্যমান ও অন্যান্য সুবিধাদি হারানোর ঝুঁকিই হলো আইন প্রণয়নজনিত ঝুঁকি (সকল বিনিয়োগই এই ঝুঁকির অধীন) ।

(চ) তারল্যের ঝুঁকি- প্রয়োজনের সময়ে অবসায়নের জন্য বিনিয়োগের অনুপলব্ধতাকেই তারল্যের ঝুঁকি বলে (স্থির-আয়ের বিনিয়োগ এবং রিয়েল স্টেট ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেগুলো ন্যায্যমূল্যে দ্রুত বিক্রি করা যায় না)।

(ছ) ক্রয় ক্ষমতার ঝুঁকি- মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগের ক্রয় ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিই হলো ক্রয় ক্ষমতার ঝুঁকি (স্থির-আয়ের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।

(জ) কর ঝুঁকি- করারোপের কারণে বিনিয়োগের মূল্যমান বা আয় হারানোর ঝুঁকিই হলো কর ঝুঁকি (অধিকাংশ বিনিয়োগই এই ঝুঁকির অধীন)।

বন্ড এবং আমানতের সনদের মতো স্থির আয়ের বিনিয়োগগুলো সুদের হার, পুনঃবিনিয়োগ, ক্রয়ক্ষমতা এবং তারল্যের ঝুঁকির মুখোমুখি হয় যেখানে স্টক এবং অন্যান্য ইকুইটিভিত্তিক বিনিয়োগগুলো বাজার ঝুঁকি দ্বারা প্রভাবিত। মিউনিসিপাল বন্ড এবং অ্যানুইটির মতো কয়েকটি বিনিয়োগের ওপর কর ঝুঁকির আংশিক প্রভাব রয়েছে। রাজনৈতিক এবং আইন প্রণয়নসংক্রান্ত ঝুঁকি থেকে কোনো বিনিয়োগই নিরাপদ নয়।     

বিনিয়োগের ঝুঁকি যত বেশি হবে, আয় তত বেশি হবে। আবার, ঝুঁকি যত কম হবে, আয় তত কমবে। কিন্তু, কষ্টার্জিত অর্থ মানুষ কম ঝুঁকিতে বেশি আয়ের ক্ষেত্রগুলোতেই বিনিয়োগ করতে চায়।

ঝুঁকিবিহীন বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই- মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া বিনিয়োগসহ সকল বিনিয়োগই কিছু না কিছু ঝুঁকি বহন করে। তবে নিম্ন থেকে মধ্যম ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগে ভালো আয় আশা করা যায়।

এ ধরনের ক্ষেত্রগুলো নিয়েই আলোচনা করা যাক।

অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ার

অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ার কোম্পানির ইস্যু করা এমন শেয়ার যেখানে কোম্পানির ইকুইটি ও দায় দুটিই রয়েছে। আয় ও সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারের মালিকরা কোম্পানির বন্ডহোল্ডারদের পরে কিন্তু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের আগে অধিকার পান। অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারগুলো সাধারণ শেয়ারের মতো স্টক এক্সচেঞ্জে পুনঃপুনঃ হাতবদল হয় না বলে এর ঝুঁকি কম। কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত লভ্যাংশ প্রদান করে। এমনকি আয় না হলেও কোম্পানি এই শেয়ারের মালিকদের লভ্যাংশ প্রদান করে থাকে।

অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারের ঝুঁকি কম; এক কোম্পানির অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারে বিনিয়োগ না করে একাধিক কোম্পানির অগ্রাধিকারযুক্ত শেয়ারে বিনিয়োগ করে ঝুঁকি আরো কমিয়ে আনা সম্ভব।

আমানতের সনদ

আমানতের সনদকে বেশ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমানতের সনদের ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ান্তে যেমন- ছয় মাস, এক বছর বা পাঁচ বছর পর পর নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়।

আমানতের সনদের একটি নমুনা; image source: phstocks.com

এটি অতিরক্ষণশীল বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ ভালো একটি ক্ষেত্র যাদের মূলধন চলে গেলে বেশ বিপদে পড়বেন। আমানতের সনদে ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত অন্যান্য ইন্সট্রুমেন্ট থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি আয় হয়।  

আমানতের সনদে তারল্যের ঝুঁকি বেশি কেননা এতে অর্থ পূর্বনির্ধারিত একটি সময় পর্যন্ত ব্যাংকের হাতে থাকে। এই ঝুঁকি কমাতে আমানতের সনদে বিভিন্ন পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এতে সনদগুলোর মেয়াদান্তে ধাপে ধাপে অর্থগুলো সুদসমেত ছাড় হয়।

আমানতের সনদের ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অর্থ তুলে ফেলা উচিৎ নয়। এতে সুদ তো হারানো যাবেই; ব্যাংকও মূলধনের কিছু অংশ রেখে দিতে পারে।

পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র

পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত হয়। এটি দশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা, একশ টাকা, পাঁচশ টাকা, এক হাজার টাকা, পাঁচ হাজার টাকা, দশ হাজার টাকা; পঁচিশ হাজার টাকা, পঞ্চাশ হাজার টাকা, এক লক্ষ টাকা, পাঁচ লক্ষ টাকা এবং দশ লক্ষ টাকা মূল্যমানের হয়ে থাকে। মূল্যমান থেকে খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে সকল শ্রেণীর সকল পেশার মানুষের জন্যই এই সঞ্চয়পত্র প্রযোজ্য।

জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাংলাদেশের সকল তফসিলভুক্ত ব্যাংক ও পোস্ট অফিস থেকে এই সঞ্চয়পত্র ক্রয় এবং নগদায়ন করা যায়। পাঁচ বছর মেয়াদী এই সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে মুনাফা এগারো দশমিক দুই আট শতাংশ। এ সঞ্চয়পত্র করতে পারবে শুধু বাংলাদেশি নাগরিক। নির্দিষ্ট সময়ের আগেও এটি নগদায়ন করা যাবে তবে সুদের হার কম হবে সেক্ষেত্রে।

সকল পেশার মানুষের জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্র হলো জাতীয় সঞ্চয়পত্র; image source: ittefaq.com.bd

এক ঝুড়িতে সব ডিম না রেখে বিভিন্ন ঝুড়িতে ডিম রাখা ভালো। কেননা কোনো একটি ঝুড়ি হাত থেকে পড়ে গেলে সব ডিম ভেঙে নষ্ট হবে না তখন। ঠিক তেমনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এক ক্ষেত্রে সব অর্থ বিনিয়োগ না করে একাধিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োজিত মূলধনের ঝুঁকি যেমন কমে তেমনি আয়যোগও হয় ভালো।

Written by Sadman Sakib

ভ্রমণের জন্য অর্থ আয়ের কয়েকটি উপায়

আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত