মাছের সাথে মুক্তা চাষ করে আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করুন!

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পের নাম হলো ঝিনুক শিল্প। মাছ চাষের সাথে সাথে ঝিনুক চাষ থেকে পাওয়া যেতে পারে মহামূল্যবান বস্তু ‘মুক্তা’। এভাবে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব। মুক্তা শৌখিনতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হলেও কিছু কঠিন রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগে। দেশের নদী-নালা, হাওর-বাওর, খাল-বিল, পুকুর-দীঘি ও জলাশয়ে ঝিনুক চাষাবাদ করে প্রতি একরে প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।

বাণিজ্যিকভাবে মুক্তা উৎপাদন করার পর তা  বিদেশে রপ্তানি করে বছর প্রতি দেড় হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বেকার সমস্যা সমাধান ছাড়াও এ থেকে বিশ-ত্রিশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের অর্থায়নে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বাংলাদেশে ঝিনুক ও শামুক সংরক্ষণ, পোনা উৎপাদন এবং চাষ প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিলো। প্রকল্পটি চলবে ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারেও মুক্তার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব মতে দশ শতাংশের একটি জলাশয়ে মুক্তা চাষে মোট ব্যয় হবে তেইশ হাজার ছয়শ চব্বিশ টাকা। আয় হবে পয়ষট্টি হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা হয় একচল্লিশ হাজার তিনশ ছিয়াত্তর টাকা। এছাড়াও মাছ চাষ থেকে আয় তো আছেই। ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রথমবারের মত ইমেজ মুক্তা চাষে সফল হয়েছে।

খামারে মুক্তাচাষে সফলতা পাচ্ছেন অনেকেই; Image Credit: samakal.com

স্বাদুপানির ঝিনুক থেকে শুরু করে পাখি, মাছ, নৌকাসহ বিভিন্ন বস্তুর নকশাতে দৃষ্টিনন্দন ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে তারা সফলতা পান। উদ্যোক্তা পর্যায়ে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও বিস্তৃত সম্ভাবনা তৈরি হবে।

মুক্তা কী

আদিকাল থেকেই দেশের প্রায় সব জায়গায় স্বাদুপানির ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। বঙ্গোপসাগরে প্রাকৃতিকভাবেই মুক্তা উৎপাদিত হয়। গোলাপি মুক্তার জন্য মহেশখালী পৃথিবীখ্যাত।

গুণগত উৎকর্ষতাসমৃদ্ধ গোলাপি মুক্তা বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, বগুড়া, ফরিদপুর, সিলেট, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে বেশি পাওয়া যায়। মুক্তা বেশ প্রাচীন পৃথিবীবিখ্যাত মূল্যবান রত্ন যা ঝিনুক থেকে পাওয়া যায়। জীবন্ত ঝিনুকের দেহের ভেতরে জৈবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় মুক্তা। বাইরের কোনো বস্তু ঝিনুকের দেহের ভেতরে প্রবেশ করে নরম অংশে আটকে পড়লে আঘাতের সৃষ্টি হয়।

ঝিনুক এই আঘাতের অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে বাইর থেকে ঢোকা বস্তুটির চারদিকে একধরনের লালা নিঃসরণ করতে থাকে। নিঃসৃত এই লালা বস্তুটির চারদিকে ক্রমান্বয়ে জমাট বেঁধে মুক্তা হয়। আয়ুবের্দিক ঔষধ তৈরিতে চূর্ণ মুক্তা ব্যবহৃত হয়। এছাড়া মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুকের খোলস হাঁস-মুরগি, মাছ ও চিংড়ির খাদ্যের প্রয়োজনীয় উপাদান ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস। অনেক দেশেই ঝিনুকের মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

মুক্তা চাষ

দেশের বিপুল জলাভূমিতে প্রণোদিত উপায়ে মুক্তা চাষ করতে পারলে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। প্রণোদিত উপায়ে ঝিনুক থেকে মুক্তা চাষ গ্রামীণ নারীরা সহজেই আয়ত্ত করতে পারে। মুক্তা চাষে নারীদের নিয়োজিত করতে পারলে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচনের দ্বারা নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব।

২০১২ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মুক্তা চাষ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নামের একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করে। তিন ধরনের পদ্ধতিতে মুক্তা আহরণ করা যায়ঃ

ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি: 

এ পদ্ধতিতে ঝিনুকের দেহের ভেতরে ম্যান্টল টিস্যু প্রবেশ করানো হয়। আকর্ষণীয় মুক্তা তৈরির জন্য ঝিনুকে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট আকারের ম্যান্টল টিস্যু প্রবেশ করাতে হবে। এক ঝিনুকে মুক্তা তৈরি করতে অন্য ঝিনুককে কেটে ফেলতে হয়। প্রথমে একটি ঝিনুককে কেটে ম্যান্টল টিস্যুর বাইরের ত্বক লম্বা করে কেটে বিচ্ছিন্ন করতে হয়। বিচ্ছিন্ন টিস্যুটিকে লম্বা করে গ্লাস বোর্ডে রাখতে হয়। লম্বা টিস্যুকে পরে (২-৩*২-৩) মি.মি আকারে টুকরো করে কাটতে হয়। এরপর টুকরো করা ম্যান্টল টিস্যু অন্য জীবিত ঝিনুকে স্থাপন করতে হয়। এভাবে অপারেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি: 

নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি এবং ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি প্রায় একইভাবে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে একসাথে ম্যান্টল টিস্যু ও নিউক্লিয়াস ঝিনুকের ভেতরে ঢোকানো হয়। নিউক্লিয়াসের ওপর মুক্তার প্রলেপ পড়ে ও মুক্তা তৈরি হয় নিউক্লিয়াসকে ঘিরেই।  

ইমেজ মুক্তা অপারেশন পদ্ধতি: 

মুক্তা ইমেজ আকারেও উৎপাদন করা যায়। মানুষ, প্রাণি বা বস্তুর ছবির মতন মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। ঝিনুকের খোলস, প্লাস্টিক, মোম, স্টিল ইত্যাদি দিয়ে ইমেজ তৈরি করা সম্ভব। এজন্য ইমেজগুলোকে প্রথমে পানিতে ভেজানো দরকার। ঝিনুকের খোলস ৮-১০ মি.মি খুলে কাঁদা, বালি ইত্যাদি পরিষ্কার করতে হবে। খোলসের কিছু অংশ থেকে পাতলা পাত দিয়ে ম্যান্টল আলাদা করতে হবে। সতর্কভাবে ইমেজ ঢুকিয়ে ম্যান্টল গর্ত থেকে বাতাস ও পানি বের করতে হবে।

অপারেশনকৃত ঝিনুকের চাষকৌশল

অপারেশনকৃত ঝিনুক ও মাছ পুকুরে একসাথে চাষ করা যায়। এক্ষেত্রে ঝিনুকগুলো নেট ব্যাগে রেখে দড়ির সাহায্যে পুকুরে ঝুলিয়ে চাষ করা হয় বা সরাসরি পানিতে ছেড়ে দিয়ে চাষ করা হয়। এরপর মাছ চাষের ব্যবস্থাপনাতেই মুক্তা চাষ করা হয়। মুক্তা চাষে বাড়তি কোন খাবার দেওয়া লাগে না। শুধু নিয়মিত চুন ও সার দিতে হয়। পনেরো দিন পর পর অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সম্ভব হলে দেশে মুক্তাচাষে বিরাট সফলতা লাভ করা সম্ভব -যা দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে। এতে অন্তত ২০-৩০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব।  

ফিচার ছবি- timelesspearl.com

Written by Sadman Sakib

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত

বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনী ব্যবসায়ী