ছাপা ও প্রকাশনার ব্যবসা থেকে আয় করুন

বই এবং সংবাদপত্র হলো অন্ধকারে আলোক শিখার মতো। মানুষের চোখ খুলে দিতে এ দুটি জিনিসের অবদান অসীম। এগুলো মানুষের সব সময়ের বন্ধু । খুব কাছের বন্ধুটি এক সময় ছেড়ে চলে গেলেও ভালো বই ছেড়ে চলে যাবে না।

বই হলো সভ্যতার ধারক ও বাহক; Image Credit: ancient-origins.net

এই বই আর সংবাদপত্র হলো প্রকাশনা প্রযুক্তির ফসল। আগের চেয়ে এখন ব্যাপক পরিমাণে প্রকাশনা প্রযুক্তির উন্নতি ঘটেছে। প্রকাশনা ও মুদ্রণ তাই আজ যেমন চেতনা ও রুচির রূপায়ন, ঠিক তেমনই আর্থিক সংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ। এতে অর্থময় সৃজনশীলতায় মেতে থাকার আনন্দ পাওয়া যায়। প্রকাশনা শিল্পের শাখা প্রশাখা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। প্রিন্টিং, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রুফ রিডিং, প্রেস পরিচালনা ও মার্কেটিং এসব নানা শাখা রয়েছে এর।

সারাবিশ্বে সফল প্রকাশনী হিসেবে পেঙ্গুইন ক্ল্যাসিকস অন্যতম; Image Credit: logos.fandom.com

আজকাল অনেকেই নানাক্ষেত্রে তাদের ক্যারিয়ার গঠন করছেন, প্রকাশনা শিল্পের নানামুখী কর্মযজ্ঞ হতে পারে ক্যারিয়ার টার্গেট, খণ্ডকালীন হিসেবেও প্রকাশনার নানা ক্ষেত্রে নিয়োজিত হওয়া যায়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং পত্রিকা অফিসে কাজ করতে পারেন, এমনকি অনেকে করছেনও। এতে একদিকে যেমন তারা তাদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে পারছে, অন্যদিকে সঞ্চয় হিসেবে বেশ কিছু টাকা হাতে থেকেও যাচ্ছে।

মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের নানা শাখা

মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পে রয়েছে কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র। বই, ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্র ছাপা বা কোনো প্রকাশনা সংক্রান্ত যত রকমের কাজ রয়েছে তার প্রত্যেকটিতে ক্যারিয়ার গঠন করা যায়। আবার ইচ্ছে করলে নিজেই প্রকাশনা সংস্থা খোলা সম্ভব। এর জন্য যে খুব বড় অংকের মূলধন খাটাতে হবে, তাও কিন্তু নয়। কারণ, এখন ডিটিপি, ছাপা ও বাঁধাইয়ের মত কাজগুলো করে দেওয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু প্রকাশনার কাজ কিভাবে ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় করতে হয় তা জানলেই হবে।

প্রকাশনার কাজকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- (ক) প্রিপ্রেস এবং (খ) পোস্টপ্রেস। ছাপায় যাওয়ার আগের কাজগুলো হচ্ছে প্রিপ্রেস ওয়ার্ক। আর ছাপা হয়ে যাওয়ার পর বাইন্ডিং, সেলস, মার্কেটিং এবং ডিস্ট্রিবিউশনের কাজ করতে হয়। এ কাজগুলোর যে কোনোটিতে ক্যারিয়ার গঠন করা যায়। তবে ধৈর্য্য ও আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করে যেতে হবে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থা, প্রকাশনা সংস্থা, এনজিও ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ

আজকাল বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থাতে এডিটর, কপিরাইটার, স্ট্রাটেজিক প্ল্যানারসহ নানা নতুন নতুন পদে লোক নেয়া হচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রকাশনা কর্মকর্তা নেওয়া হয়। ক্যাম্পেইন ও অ্যাডভোকেসি নির্ভর এনজিওগুলোতেও এ পেশার কদর বাড়ছে দিন দিন। এ সকল এনজিওর পোস্টার, ফটো স্টোরি, বার্ষিক প্রতিবেদন, ক্যাটালগ বুলেটিন, বই, জার্নাল ইত্যাদির প্রয়োজন হয়।

অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকাশনা কাজের জন্যে নিজেদের কর্মী ছাড়াও বাইরের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, অ্যাড ফার্মের সহায়তা নেয়। ফলে খণ্ডকালীন অথবা পূর্ণকালীন হিসেবে সহজেই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়া যায়। সংবাদপত্র অফিস, বিভিন্ন কর্পোরেট ও প্রকাশনা সংস্থায় ভাল বেতনে চাকরি পাওয়া যেতে পারে। মোবাইল কোম্পানি, বিজনেস কর্পোরেশনে ইদানিং ব্র্যান্ডিং পাবলিকেশনের ভালো ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

প্রকাশনা শিল্পে বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং কাজের সুযোগ ইত্যাদি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এখন প্রকাশনা শিল্পে দারুণ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর আগের বই এবং এ সময়ের একটি বইয়ের মেকআপ, গেটআপ, ছাপা, ইলাস্ট্রেশন, বাইন্ডিং, লেমিনেশনে তফাৎটা স্পষ্ট। কেননা সময়ের পরিবর্তনে পাঠকদের রুচিতেও পরিবর্তন এসেছে। তাই কাজটা পাঠকের রুচিমাফিকই হতে হবে।  

বই বিক্রি বাড়াতে সারাবছর নানা মেলার আয়োজন করে প্রকাশনা সংস্থাগুলো; Image Credit: lib.ewubd.edu  

ক্যারিয়ার চিন্তা

মুদ্রণ ও প্রকাশনা ক্ষেত্রের পরিধি বিশাল। তাই প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে মুদ্রণ ও প্রকাশনার কোন শাখাটিতে ক্যারিয়ার গড়া যায়। সে শাখার ওপর একাডেমিক পড়াশোনা থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। অন্য বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে পাবলিশিংয়ের উপর ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট কোর্স করা যায় কেননা অন্য পেশার মতো এটি সাধারণ কোনো বিষয় নয়।

কারিগরি বিষয়গুলো জানা থাকলে এ পেশায় খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি করা সম্ভব। কাজের ধরন, প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, যোগ্যতা ইত্যাদি অনুযায়ী বেতন ও অন্যান্য পেশাগত সুযোগ সুবিধা নির্ধারিত হবে। তারপরও যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিমাসে দশ থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। মুদ্রণ ও প্রকাশনায় একাডেমিক ডিগ্রী বা ডিপ্লোমা নেওয়া থাকলেও কম্পিউটার চালানোর দক্ষতা থাকা আবশ্যক।

অফিস প্যাকেজের বাইরে পেজ মেকাপের জন্য কোয়ার্ক এক্সপ্রেস, অ্যাডোবি ইন-ডিজাইন জানতে হবে।

পেইজ মেকআপের জন্য প্রয়োজন কোয়ার্ক এক্সপ্রেস; Image Credit: logolynx.com

বিজ্ঞাপনের জন্য পেজ মেকআপ আর ফটো এডিটিং ও অন্যান্য কাজের জন্য অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর ইত্যাদি জানতে হবে। ইদানিং, বেশির ভাগ সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনের মেকাপ কোয়ার্ক এক্সপ্রেস এবং অ্যাডোবি ইন-ডিজাইন সফটওয়্যারে হচ্ছে। কাজেই এগুলো জানা থাকলে ভাল হয়। প্রেসের কাজের ওপর ভালো ধারণা থাকা জরুরী। কিছু প্রকাশনাতে ছবির ইলাস্ট্রেশন বা অলংকরণ ও ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনো শুধু ইলাস্ট্রেশন, কখনো আবার ইলাস্ট্রেশন ও ছবি দুটোরই সমন্বয়ে মেকআপ হয়। এসব কাজ ভালোভাবে বুঝলে কাজগুলো মানসম্মত হবে।  

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাকরী না করে নিজেই প্রকাশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রথমেই প্রকাশনা সংস্থার চমৎকার একটা নাম নির্বাচন করতে হবে। অফিস ও সেলস কাউন্টার বসাতে হবে। আসবাবপত্র, কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। কর্মী নিয়োগ করতে হবে। দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগ করতে হবে। প্রকাশনা সংস্থার নামে ট্রেড লাইসেন্স করতে হবে। কোনো ব্যাংকে একটি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। প্যাড, মানি রিসিপ্ট, ভাউচার, খাম ও প্রয়োজনীয় অফিস ডকুমেন্ট ছেপে নিতে হবে।

বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কোন ধরনের প্রকাশনা নিয়ে প্রতিষ্ঠান কাজ করবে সেটি নির্ধারণ করতে হবে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি হতে পারে প্রকাশনার বিষয়। লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বন্ধুসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কাগজ বিক্রেতা ও প্রেসের সাথে চাহিদা ও আর্থিক ব্যয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তারা বিশেষ কোন সুযোগ সুবিধা দিতে পারবেন কিনা এ ব্যাপারটি জেনে নিতে হবে। মার্কেটিংয়ের জন্য মার্কেটিং টিমের সঙ্গে এজেন্টদের নিয়ে আলোচনা করা জরুরী। প্রকাশনা সংস্থাকে পরিচিত করে তুলতে সংবাদপত্রকে কাজে লাগাতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রকাশনা শিল্পে যে কেউ স্বাগতম। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উন্নতি ও বিকাশ ঘটাতে এ শিল্পের অবদান অনেক।

ফিচার ছবি- amethystbd.com

Written by Sadman Sakib

বাংলাদেশের শীর্ষ দশ ধনী ব্যবসায়ী

ট্রাভেল গাইড হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে যা জানা প্রয়োজন