আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত

বিশ্বায়নের এই সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য আর নির্দিষ্ট স্থানে আটকে নেই। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববাজারে পণ্য কেনাবেচায় চলছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশও আছে।

আজ আমরা আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসায়ের সকল খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করবো।

সম্ভাবনাময় খাত

বাংলাদেশি বেশ কয়েকটি পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসকল কারণেই বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি খাতে অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হস্তশিল্প, অডিও সিডি, চিংড়ি, চামড়াজাত দ্রব্য, পোশাকশিল্প, পোলট্রি খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রপ্তানির বাজার রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে ইদানিং পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।

রপ্তানির ক্ষেত্রে পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা অনেক; image source: wecanpackage.com

ব্যবসায়ের শুরু

আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় যে কেউ বিনিয়োগ করতে পারেন সহজেই। এক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন থাকতে হবে। যেকোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন। আমদানি-রপ্তানিমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) এবং রপ্তানি নিবন্ধন সনদ(ইআরসি)।

ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা অফিস থেকে এবং আইআরসি ও ইআরসি সনদ সংগ্রহ করতে হবে প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে। আমদানি নিবন্ধন সনদের জন্য আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে নির্ধারিত ফর্ম ডাউনলোড ও পূরণ করে অন্যান্য কাগজপত্রের সাথে দাখিল করতে হবে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন আঞ্চলিক কার্যালয়ে।

পুরানা পল্টনে অবস্থিত আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দপ্তর; image source: picasa.google.com

আমদানি মূল্যসীমা পাঁচ লক্ষ টাকা হলে পাঁচ হাজার টাকা আর আমদানি মূল্যসীমা পাঁচ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে ষাট হাজার টাকা প্রাথমিক নিবন্ধন ফি দিতে হবে (সকল ফি এর ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য)। তিন কর্মদিবসের মধ্যে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে নিবন্ধন সনদ গ্রহণ করা যাবে।

রপ্তানি নিবন্ধন সনদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক নিবন্ধন ফি সাত হাজার টাকা। পণ্যের ধরন মোতাবেক প্রাতিষ্ঠানিক সনদ বা চেম্বার অফ কমার্সের অনুমোদন থাকাও প্রয়োজন। এরপরেও পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অনুমোদনের দরকার হতে পারে। এই অনুমোদনের মধ্যে আছে সাপটা ও সাফটা সনদ (সার্কভুক্ত দেশের ক্ষেত্রে), জিএসটিপি সনদ ও সিও সনদ (ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে) এবং কেপিটি সনদ (কোরিয়ার ক্ষেত্রে)।

সাপটা ও সাফটা সনদে স্বাক্ষরদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের নমুনা স্বাক্ষর; image source: epb.gov.bd

ব্যাংকের কাজ

আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা শুরু করলে প্রথমেই একটি ব্যাংক হিসাব খোলা প্রয়োজন। ব্যাংকের প্রদত্ত স্বচ্ছলতার সনদে ব্যবসায়ের স্বীকৃতির ব্যাপারটি গুরুত্ব পাবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা বিনিয়োগের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে থাকেন। ব্যাংকগুলো আমদানিকারকের পক্ষে লেটার অফ ক্রেডিট ইস্যু করে রপ্তানিকারককে পণ্যের মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে।

কী ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি সুবিধাজনক

আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কী ধরনের পণ্যের চাহিদা কোন দেশে কেমন সে বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। ইউরোপের অনেক দেশে বাংলাদেশের পাটের তৈরি পণ্য এবং ফুলের কদর রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে বাংলাদেশি পোশাকের ব্যাপক কদর আছে। এসকল বিষয়ে ভালো ধারণা রেখে পণ্য বাছাই করতে হবে।

বাংলাদেশে আমদানিজাত পণ্যগুলোর মধ্যে আছে শিল্প-কারখানার জন্য কাঁচামাল, নির্মাণসামগ্রী, ওভেন, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন গৃহসামগ্রী যন্ত্রপাতি, ওষুধ, খাদ্যশস্য, চর্বি, রাসায়নিক দ্রব্য, শিশুখাদ্য,  পরিবহনসামগ্রী, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশন, খনিজতেল, ভোজ্যতেল, পানীয় দ্রব্য ইত্যাদি। আর রপ্তানিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, রকমারি ফুল, চা, চামড়া, তামাক, পাটজাত দ্রব্য, ওষুধ, পাট ইত্যাদি।

যোগাযোগের দক্ষতা

আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে যোগাযোগের দক্ষতা বেশ জরুরি বিষয়। বিশ্বের নানা দেশের আমদানি ও রপ্তানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে এবং বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্তাব্যক্তিদের সাথে ভালো যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম মূল্যে কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় প্রবল।

চুক্তি মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করে দেওয়া আবশ্যক এবং নিজের বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে হবে। দুটি মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি হয়- একটি নৌপথ ও আরেকটি আকাশপথ। বেশি পরিমাণে ভালো মানের পণ্য পাঠানোর জন্য মালবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ ভালো।

বিদেশি ভাষায় দক্ষতা

আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ে বিদেশি ভাষা জানা গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু পণ্যের বেচাকেনা সবই বিদেশী পক্ষের সাথে করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বেচাকেনার ক্ষেত্রে ইংরেজিসহ অন্যন্য ভাষা জানা থাকলে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে কথা বলতে সুবিধা হয়। ফরাসি, স্প্যানিশ, মান্দারিন, জাপানিজ, জার্মান ভাষা জানা থাকলে এ পেশায় বেশ সুবিধা পাওয়া যায়, কেননা এই দেশগুলো বাংলাদেশে পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে বেশ বড় ভূমিকা রাখছে।

প্রতিষ্ঠানের অবস্থান

আমদানি-রপ্তানি করতে সহজ হয় এমন স্থান প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারণ করতে হবে। ব্যবসার জন্য সমুদ্রবন্দর বা স্থলবন্দর এলাকা নির্বাচন করলে কাজ করা অনেক সহজ হবে। দুটি পথে বিভিন্ন ধরনের লোক নিয়োগ করতে পারেন। শুল্ক বিভাগকেন্দ্রিক এবং সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পথে লোক নিয়োগ করতে পারেন।

ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট নিয়োগ করা যেতে পারে। আমদানি-রপ্তানি বা অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ে আমদানিকারকের কাছ থেকে রপ্তানিকারকের কাছে বা বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতার কাছে প্রেরণের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী মাধ্যম হিসেবে কাজ করা ক্লিয়ারিং এবং ফরওয়ার্ডিং এজেন্টের কাজ। অবশ্যই সময়মতো রপ্তানির পণ্য পাঠাতে হবে এবং আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে খালাস করতে হবে।  

সহযোগী প্রতিষ্ঠান

আমদানি-রপ্তানির ব্যাপারে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলো, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন, বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোর স্থানীয় শিপিং এজেন্ট (সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট) এবং শিল্প ও বণিক সমিতি।

সাধারণ বীমা কর্পোরেশন নৌবামা করে নৌপথে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ঝুঁকি হ্রাস করে; image source: designway4u.blogspot.com

প্রাতিষ্ঠানের পরিচিতি

এ ব্যবসায়ে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ছড়াতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। প্রচারপত্র ও বিলবোর্ডের মাধ্যমেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি বাড়াতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আস্থা অর্জন করতে পারলে ক্রেতারা বার বার প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হবে।

যা বর্জন করতে হবে

ক্রেতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা যাবে না কোনো অবস্থাতেই। এতে ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট হবে। গৃহীত নমুনা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সময় পণ্যের মান নিশ্চিত করার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে হবে। ব্যবসায়িক লেনদেনের গোপন তথ্যগুলো প্রকাশ করা যাবে না।

ব্যবসায়িক জ্ঞান লাভে ব্যক্তি বা সংস্থার সদুপদেশ এড়িয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। ব্যবসা পরিচালনায় দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলা জরুরি। ব্যবসায়ে সাময়িক লাভের কথা ভেবে ভারসাম্যহীন দর প্রদান করে ব্যবসায়িক নৈতিকতা নষ্ট করা যাবে না। দেশের স্বার্থপরিপন্থী বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এমন ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে বিরত থাকতে হবে।  

পরিশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশের অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই পণ্য আমদানি-রপ্তানি করে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মাননিয়ন্ত্রণ, সময়ানুবর্তিতা ও ব্যবহারকারীর ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।

Written by Sadman Sakib

কম ঝুঁকিতে উচ্চ আয়ের বিনিয়োগ ক্ষেত্র

ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে অর্থ আয়