ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত

ভ্রমণ পিপাসু যে কোনো মানুষই সাগ্রহে ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবতে পারেন। ভ্রমণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, ট্রাভেল প্যাকেজ তৈরি করা, কোথায় কোন সময়ে বেড়াতে যাওয়া ভালো এবং খরচ কেমন এসব ব্যাপারে খোঁজ রাখা, হোটেল-ভেহিক্যাল রিজার্ভেশন, ভিসার ব্যবস্থা করা- ইত্যাদিই হলো একজন ট্রাভেল এজেন্টের কাজ। এসকল কাজই একজন ট্রাভেল এজেন্ট অর্থের বিনিময়ে করে থাকে।

অধিকাংশ মানুষ বেড়াতে বেশ পছন্দ করে। সাগর, পাহাড়, প্রকৃতি, বিভিন্ন স্থাপনা ইত্যাদি দেখার শখ রয়েছে মানুষের। পারিবারিক ভ্রমণ, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো, একা বেড়াতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, কাজের প্রয়োজনেও মানুষকে নানা জায়গায় যেতে হয়। সেক্ষেত্রেও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর প্রয়োজন হয়। অভিনব কৌশল, বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতা দিয়ে এ পেশাকে আরো চমকপ্রদ করা যায়। 

পেশা হিসেবে ট্রাভেল এজেন্সির সম্ভাবনা অনেক; Image Credit: arian-tour.com

ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অপার। পর্যটন খাতের এমন বিপুল সম্ভাবনাকে ঘিরেই পুরানো এজেন্সিগুলোর সাথে সাথে নতুন নতুন এজেন্সি গড়ে উঠছে। ট্রাভেল এজেন্সি চালু করার কিছু নিয়মাবলী রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ‘ট্রাভেল এজেন্সি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (TAMS) এর মাধ্যমে নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত ট্রাভেল এজেন্সিসমূহের নিবন্ধন ও নবায়ন কার্যক্রম অনলাইনে করা হয়। এই অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। বিদ্যমান এজেন্সির নবায়ন এবং নতুন এজেন্সির নিবন্ধনসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমতির আবেদন করতে এই ওয়েবসাইটে লগইন করতে হবে৷ তিন বছরের জন্য ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে এটি পুণঃনবায়ন করা যায়।

ওয়েবসাইটে নির্ধারিত ফরম যথাযথভাবে পুরণপূর্বক আবেদন করতে হয়। আবেদন ফরমের সাথে নিচের দলিলপত্রাদি দাখিল করতে হয়ঃ

(ক) আবেদন ফি জমার ট্রেজারি চালানের মূল কাগজ
(খ) হালনাগাদকৃত ট্রেড লাইসেন্সের সত্যায়িত অনুলিপি
(গ) টি আই এন সার্টিফিকেট
(ঘ) ব্যবসায়িক ঠিকানার হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রশিদ/ বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র এবং ভাড়া পরিশোধের রশিদ
(ঙ) লিমিটেড কোম্পানি/ অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট অফ ইনকর্পোরেশন এর সত্যায়িত অনুলিপি, আর্টিকেল অব এসোসিয়েশন/অংশীদারি চুক্তি
(চ) ন্যূনতম দশ লক্ষ টাকা জমার ব্যাংক সার্টিফিকেট
(ছ) তিনশত টাকার নন- জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামা
(জ) নিবন্ধন ফি ও ভ্যাট জমার ট্রেজারি চালানের মূল কপি

পাঁচ হাজার টাকা আবেদন ফি বাবদ ১-৫৩০১-০০০১-১৮১৬ নম্বর কোডে “বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সচিবালয়-সচিবালয় ফার্মস এন্ড কোম্পানীজ রেজিস্ট্রেশন ফিস”-এর অনুকূলে জমা দিতে হয়।

নির্ধারিত কোডে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে আবেদন ফি জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আবেদন দাখিল করা হলে তা পনেরো দিনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে সঠিক কিনা নির্ধারণ করা হয়। সঠিক হিসেবে প্রতীয়মান হলে নির্ধারিত নিবন্ধন ফি ও ভ্যাট জমা দেওয়ার জন্য পনেরো দিনের মধ্যে সরকার দাবিপত্র জারি করবে।

পঞ্চাশ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি বাবদ ১-৫৩০১-০০০১-১৮১৬ নম্বর কোডে “বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সচিবালয়-সচিবালয় ফার্মস এন্ড কোম্পানীজ রেজিস্ট্রেশন ফিস”-এর অনুকূলে এবং সাত হাজার পাঁচশ টাকা ভ্যাট বাবদ ১-১১৩৩-০০১০-০৩১১ নং কোডে ট্রেজারি চালানমূলে বাংলাদেশ ব্যাংক/সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ট্রেজারি চালানের মূলকপি হাতে পাওয়ার পর তা অনলাইনে যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে। নিশ্চিত হবার পনেরো দিনের মধ্যে এজেন্সির নিবন্ধন সনদ জারি করা হয়।

এর বাইরে ট্রাভেল এজেন্সির নবায়ন, কার্যালয় স্থানান্তরের অনুমতি এবং ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট ইস্যুর জন্যও ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সাইটটিতে নির্দিষ্ট আবেদন ফরম রয়েছে।  

ট্রাভেল এজেন্টের কাজ

ট্রাভেল এজেন্সির কাজ হলো একজন ট্যুরিস্টকে ট্যুর সংক্রান্ত সকল সুবিধা দেওয়া; Image Credit: traveller.com.au

ট্যুর সংক্রান্ত যাবতীয় সেবাদানের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আয় করাই ট্রাভেল এজেন্টের কাজ। ট্রাভেল এজেন্টের নির্দিষ্ট কাজগুলো হলোঃ

(ক) হোটেল/ ট্রেন/ বাস/ এরোপ্লেনের বুকিং/ বাতিল/ রিফান্ড করা

(খ) ট্যুরের বিস্তারিত পরিকল্পনা করা

(গ) গ্রাহকের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা

(ঘ) গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি করা

(ঙ) গ্রাহকদের সময় এবং বাজেট মোতাবেক ট্যুরের গন্তব্য এবং ট্যুর প্যাকেজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া

(চ) ভিসা সংক্রান্ত ব্যাপারে সর্বাত্মক সাহায্য করা

(ছ) এয়ারলাইন্স, হোটেলগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা এবং তাদের অফার সম্পর্কে খোঁজ রাখা

ট্রাভেল এজেন্টের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা

একজন ট্রাভেল এজেন্টকে অবশ্যই সৃজনশীল ও দূরদর্শী হতে হবে। নতুবা এ ব্যবসায়ে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ট্রাভেল এজেন্টের যেসকল দক্ষতা ও জ্ঞান থাকা উচিৎ সেগুলো হলোঃ

(ক) নিজের ভাষার বাইরে ইংরেজিসহ অন্তত দুইটি ভাষায় পারদর্শী হওয়া উচিৎ

(খ) গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS) যেমন GALELIO,SABRE ও AMADUES অপারেট করতে জানা উচিৎ

গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম এর নানা অংশ; Image Credit: profitroom.com

(গ) ভৌগোলিক জ্ঞান স্পষ্ট হতে হবে

(ঘ) কনভিন্সিং এবং নেগোসিয়েশন স্কিল খুব ভালো হতে হবে

(ঙ) বিভিন্ন দেশের ভিসা, ভ্রমণ, অভিবাসন, ব্যাগেজ ইত্যাদি সংক্রান্ত নীতিমালা জানতে হবে

(চ) এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর এবং হোটেল বুকিং এর নিয়মকাননু জানতে হবে

(জ) সময় মেনে চলতে হবে, পরিশ্রমী হতে হবে এবং গ্রাহকদের আন্তরিকভাবে সেবা দিতে হবে

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা

এয়ার টিকেটিং এন্ড ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশনস এর ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রী অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস বাংলাদেশ (ATAB) ট্যুরিজম ট্রেনিং ইন্সটিটিউট থেকে অর্জন করা যায়। ট্রাভেল এজেন্টদের জন্য বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টার এবং বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশনের ওপর কোর্স করানো হয়। এছাড়া AMADEUS এবং SABRE এর ট্রেনিং সেন্টারসহ অসংখ্য বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম, টিকেট ফেয়ার এন্ড রিজার্ভেশন সিস্টেমের ওপর কোর্স করানো হয়।

কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগ

ভ্রমণ প্রিয় মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ভ্রমণকালীন অনিশ্চয়তা ও ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য এবং সাশ্রয়ে পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসার জন্য ট্রাভেল এজেন্সির শরণাপন্ন হচ্ছে মানুষ। দেশে ও বিদেশে নানা কাজে মানুষ এদিক-ওদিক যাচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবছরে বিপুল সংখ্যক মানুষ হজ্ব করতে যাচ্ছে। এ সকল চাহিদার কথা মাথায় রেখেই দেশে দুই হাজারের বেশি ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে উঠেছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত হজ্ব এজেন্সিও প্রায় তেরোশ। পর্যটকদের চাহিদার চাপ সামলাতে ও পর্যটন খাতের প্রসারের কারণে সামনের দিনগুলোতে আরো ট্রাভেল এজেন্সি চালু হবে। 

এ ব্যবসায়ে পনেরো লক্ষ থেকে ত্রিশ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার থেকে দুই লক্ষ আয় করা সম্ভব। তবে এ ব্যবসায়ে উন্নতির জন্য প্রয়োজন ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করার মানসিকতা, দীর্ঘমেয়াদে ভালোভাবে ব্যবসায় করার আগ্রহ এবং যেকোনো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

ফিচার ছবি- traveltechstrategies.com

Written by Sadman Sakib

ট্রাভেল গাইড হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে যা জানা প্রয়োজন

মাছের সাথে মুক্তা চাষ করে আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করুন!