বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার হাল হকিকত

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মাঝে তৃতীয়টি হল বাসস্থান। খাদ্য এবং বস্ত্রের চাহিদা পূরণ হওয়ার পরপরই মানুষ নিজেদের জন্য আবাস খোঁজার দিকে মনোযোগ দেয়। বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসে নিজের আবাসনের এই প্রয়োজনটা আরও প্রকট হয়েছে। প্রয়োজনের সাথে সাথে এটা পরিণত হয়েছে একটি বিনিয়োগে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে। তাই আর ভাঁড়া করা বাসায় দিনাতিপাত না করে প্রত্যেকেই নিজেরা বাড়ির মালিকানা অর্জনের চেষ্টা করছে।

নগরায়ন বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেটকে ক্রমেই জনপ্রিয় করছে; image source: localguidesconnect.com

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় শহুরে মধ্যবিত্তদের জন্য জমি কিনে বাড়ি করাটা প্রায় দুঃসাধ্যই বলা যায়। বিশেষ করে ঢাকার মতো মেগাসিটিতে এটা প্রায় স্বপ্নের মতই। এছাড়া অনেক উচ্চবিত্তরাও বাড়ি করার ঝামেলার মধ্যে যেতে চান না। এই দুই শ্রেণীর মানুষের কাছেই আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশে বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাতে বেশি সক্রিয় এসব কোম্পানিগুলো।

রিয়েল এস্টেট ব্যবসা কী?

প্রথমেই রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর কাজ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। অধিকাংশ সময়েই রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো জমির মালিক এবং বাড়ির ক্রেতাদের মাঝে সংযোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। প্রথমেই তারা বাড়ি করার উপযোগী জায়গার সন্ধান করে। সেটি পাওয়া গেলে জমির মালিকের কাছ থেকে সেটি কিনে তারা সেখানে নিজেদের অর্থায়নে বহুতল ভবন নির্মাণ করে।

ভবন নির্মাণকালীন সময়ে বা নির্মাণ শেষে তারা সেই ভবনের ফ্ল্যাটগুলো ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। শুধু যে আবাসিক ভবনই নির্মাণ করে এমন নয়। বিভিন্ন অফিস স্পেস বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের কাজের ভেতরে পড়ে। অর্থাৎ, ভবন নির্মাণের যাবতীয় দায়িত্ব থাকে তাদের হাতে এবং পরবর্তীতে তারা সেগুলো নির্ধারিত দামে বিক্রিও করে। এই ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ কর্মই রিয়েল এস্টেট ব্যবসার অন্তর্গত।

নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম রিয়েল এস্টেট; image source: balboateam.com

বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা

বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই এর যাত্রা শুরু। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পুরোটাই মূলত নগরায়নের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এটা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, স্বাধীনতার পরপর এদেশে যখন গ্রাম কেন্দ্রিক জীবনের পরিবর্তে শহুরে নাগরিক সমাজ গড়ে উঠলো তখন থেকেই রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও তার পথচলা শুরু করে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ শহরে বসবাস করতো। ২০১১ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ শতাংশে। আর এই ব্যাপক নগরায়নের প্রধান চাপ এসে পড়তে থাকে ঢাকাতে। রাজধানী ঢাকায় দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। শহরে এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন সমস্যা মেটানোর দায়িত্ব তখন কাঁধে তুলে নেয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা।

দেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে; image source: pinterest.com

৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে ৫টি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি নিয়ে বাংলাদেশে এই ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। তখন ইস্টার্ন হাউজিং এবং প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট নামক দুইটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করে। ৭০ এর দশকে যাত্রা শুরু করলেও এদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা প্রাণ পায় ৮০’র দশকের শেষে। এরপরে ক্রমেই বাড়তে থাকে এর বিস্তার। প্রচুর রিয়েল এস্টেট কোম্পানি আবাসন ব্যবসায় নিজেদের যুক্ত করে। বর্তমানে তো দেশের এই বেসরকারি আবাসন খাত মোট নগর আবাসনের অর্ধেকটাই মেটাচ্ছে।

রিহ্যাব

দেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার প্রসারের সাথে সাথে কিছু বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। গ্রাহক পর্যায়ে নানা অভাব অভিযোগ বাড়তে থাকে। টাকা নিয়ে সঠিক সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করা, নির্মাণে গুণগত মান বজায় না রাখাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয় এই খাত। এসকল অনিয়ম রুখতে এবং সরকারের সাথে আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মধ্যস্থতা করার উদ্দেশ্যে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা রিহ্যাব। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রিহ্যাবের সদস্য ছিল মাত্র ১১টি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১১৯১।

দেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার অভিভাবক বলা হয় রিহ্যাবকে; image source: unb.com.bd

বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী দায়িত্ব পালন করে থাকে রিহ্যাব। যেমন বৈধভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রত্যেক রিয়েল স্টেট কোম্পানিকেই অবশ্যই রিহ্যাবের সদস্যপদ অর্জন করতে হবে। রিহ্যাবের সদস্যপদ অর্জনের জন্য কোম্পানিগুলোকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এরফলে ক্রেতাদের উন্নত সেবা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে রিহ্যাব। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি নিয়ে যেকোন অভিযোগের বিষয়ে খতিয়ে দেখার দায়িত্বও রিহ্যাবের রয়েছে। 

এছাড়া আবাসন ব্যবসায়ীদের নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের সাথে দরকষাকষি করে রিহ্যাব। আবাসন ব্যবসায়ীদের সুবিধা, ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে তারা। সরকারও বেসরকারি আবাসনের দিকে বর্তমানে গুরুত্ব দিয়েছে।

এই খাতের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠতে এবং মালিক-ক্রেতাদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন। এই আইনের সাতটি অধ্যায়ে ক্রেতা এবং রিয়েল এস্টেট কোম্পানি উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে এমন ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। এই আইন প্রণয়নের ফলে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিদ্যমান থাকা নানা অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির পরিমাণও কমে আসছে।

রিয়েল এস্টেটে ক্যারিয়ার

তরুণদের মাঝে রিয়েল এস্টেটে ক্যারিয়ার গড়ার প্রবণতা ব্যাপক। রিয়েল এস্টেট কেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসায় তারা অংশ নিতে পারে। রিয়েল এসেস্ট এজেন্ট হিসেবে অনেকে ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে প্রাধান্য পান। আবার এই ব্যবসায় প্রচুর আর্কিটেক্ট প্রয়োজন। সুতরাং যারা বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেকচারে পড়াশুনা করছেন তারাও যুক্ত হতে পারেন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সাথে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ডিপার্টমেন্ট অফ রিয়েল এস্টেট নামে আলাদা বিভাগই খুলেছে। রিয়েল এস্টেট সংক্রান্ত পড়ালেখায় ২০০৮ সাল থেকে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এখান থেকে পড়ালেখা করেও আপনি রিয়েল এস্টেটে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।       

Written by Sizan Ahmed

রিয়েল এস্টেট সংক্রান্ত ৫টি আয়ের ক্ষেত্র

নতুন উদ্যোক্তাদের যে ভুলগুলো থেকে সাবধান হতে হবে