ট্রাভেল গাইড হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে যা জানা প্রয়োজন

দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করেন যারা তারা পছন্দের তালিকায় ট্রাভেল গাইড হওয়াকে শুরুর দিকেই রাখতে পারেন। বাংলাদেশে ট্রাভেল গাইড হিসেবে কাজ করলে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বাংলাদেশে অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে পারবেন ইচ্ছেমতো।

ট্রাভেল গাইডিং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি পেশা; Image Credit: indiaeducation.net

ট্রাভেল গাইড হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই এবং অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন এরকম মানুষদের ক্ষেত্রে বিরক্তি বা ক্লান্তি ভর করবে– এমন সুযোগও নেই।

ট্রাভেল গাইডের কাজ করার ক্ষেত্র

দুই উপায়ে ট্রাভেল গাইড হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকে। প্রথম উপায় হলো নিজে একটি ট্রাভেল অ্যাসিস্টেন্স এজেন্সি অথবা ট্রাভেল প্রতিষ্ঠান খুলে ট্রাভেল গাইডের কাজ করা। এক্ষেত্রে স্বল্প পুঁজি নিয়ে এই পেশায় জড়িত হওয়াটা বেশ কঠিন। তবে ইদানিং বাংলাদেশের কক্সবাজার, বান্দরবান, সেন্টমার্টিন, সিলেট, সুন্দরবনসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সময় পেলেই মানুষকে ভ্রমণ করতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশের ফলে ট্রাভেল গাইডিং এর নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে; Image Credit: pinterest.com

এ কারণে সামনের দিনগুলোতে ট্রাভেল গাইডের জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয় উপায় হলো যেকোনো একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে ট্রাভেল গাইড হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া। বান্দরবান বা সুন্দরবনের মত দুর্গম এলাকাগুলোতে ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল গাইডের চাহিদা বেশি দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানের হয়ে ট্রাভেল গাইডের কাজ করার ক্ষেত্রে চাকরির ধরন হতে পারে দৈনিক, মাসিক অথবা বাৎসরিক চুক্তিভিত্তিক। এক্ষেত্রে বিষয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানে আলাদা হয়।

এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বেশিরভাগ ট্রাভেল গাইডই খণ্ডকালীন হিসেবে কাজ করেন। ভ্রমণের মৌসুম বাদে অন্য সময়ে ট্রাভেল গাইডদের কাজ থাকে না। আবার ভ্রমণের মৌসুম এলে বিপুল পরিমাণ ট্রাভেল গাইডের প্রয়োজন হয় এবং তখন ট্রিপ অনুযায়ী আয়ও বেশ ভালো হয়। তবে এটি সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

ট্রাভেল গাইডের কাজ

ট্রাভেল গাইডের দায়িত্বগুলো হলোঃ

(ক) মাসিক ও বাৎসরিক চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত ট্রাভেল গাইড ভ্রমণকারীদের সকল চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা মেটানোর দায়িত্বে থাকেন। এসবের মধ্যে ভ্রমণকালীন যাতায়াত, খাবার এবং অবকাশযাপনের সকল সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে। দৈনিক চুক্তিতে কাজ করা ট্রাভেল গাইডদের দায়িত্ব হলো ভ্রমণের সময় ভ্রমণস্থল ঘুরিয়ে দেখানো। এক্ষেত্রে ঘোরার সময় ভ্রমণকারীদের চাহিদা মেটানো ও আপ্যায়নের দায়িত্ব তার উপরে ন্যস্ত থাকে। সাধারণত প্রতিষ্ঠান থেকেই সব হিসেবমাফিক ঠিক করে দেয়া থাকে। সেসব জিনিস ঠিকভাবে অতিথিদের কাছে যাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা ট্রাভেল গাইডের দায়িত্ব।

(খ) ভ্রমণে দেশি-বিদেশি দুই ধরনের অতিথিই থাকেন। ট্রাভেল গাইডের দায়িত্ব হলো তাদের সাথে কথা বলে সব ঠিক আছে কিনা খবর নেওয়া। ভ্রমণের স্থান ঘুরে দেখানোর সময় ট্রাভেল গাইড অতিথিদের সেখানকার ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলে থাকেন। কোথায় কী আছে বা জায়গাটির বিশেষত্ব থাকলে তা অতিথিদের জানানো ট্রাভেল গাইডের দায়িত্ব।

(গ) ট্রাভেল এজেন্সিগুলো যেসব জায়গায় অতিথিদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় সেসব প্রতিষ্ঠানের(রেস্ট হাউজ, রেস্টুরেন্ট, হোটেল প্রভৃতি) সাথে ভ্রমণকালীন যোগাযোগের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ট্রাভেল গাইডের।

ট্রাভেল গাইডের স্থান সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান থাকা আবশ্যক; Image Credit: insidermonkey.com

(ঘ) কোন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তির মাধ্যমে ভ্রমণ সবচেয়ে কম খরচে সম্পাদন করা সম্ভব সে ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান রাখা ট্রাভেল গাইডের একান্ত কর্তব্য। তবে অতিথিদের সেবা ও আপ্যায়নের মান নিয়ে কোন আপস করা যাবে না। ভ্রমণে অতিথিদের নিরাপত্তার সকল দায়ভার ন্যস্ত থাকে ট্রাভেল গাইডের ওপর।

(ঙ) কখনো কখনো ডেস্ক জবগুলো ট্রাভেল গাইডের ওপর ন্যস্ত থাকে। ডেস্ক জবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাতায়াতের জন্য বাস বা যানবাহন ঠিক করা, রেস্ট হাউজ বা হোটেল বুকিং দেয়া, খাবার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

ট্রাভেল গাইডের যোগ্যতা

সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাই ট্রাভেল গাইড হিসেবে খণ্ডকালীন চুক্তিতে কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কখনো কখনো ইংরেজিতে কথা বলতে পারার দক্ষতা দেখা হয় যদি ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ গ্রাহক বিদেশি নাগরিক হোন। তবে নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্যুরিজম বিষয়ে অনার্স বা ডিপ্লোমা ডিগ্রীধারী কাউকে খুঁজে থাকে।

ট্রাভেল গাইডের দক্ষতা ও জ্ঞান

ট্রাভেল গাইডের যে সকল দক্ষতা ও জ্ঞান থাকা জরুরী সেগুলো হলোঃ

(ক) ইংরেজিতে কথা বলতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো ইংরেজিতে দক্ষতার সার্টিফিকেটও দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে।

(খ) ইংরেজির পাশাপাশি অন্য বিদেশি ভাষা জানা থাকা।

(গ) ট্রাভেল গাইডকে নম্র ও ভদ্র হতে হবে। অতিথিদের সাথে কোনো অবস্থাতেই বাজে ব্যবহার করা যাবে না।

(ঘ) ট্রাভেল গাইডকে সৎ হতে হবে। মিথ্যা বলে অতিথি এবং তার প্রতিষ্ঠানকে ঠকানো ট্রাভেল গাইডের কাজ হওয়া উচিৎ নয়। অতিথিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে।

(ঙ) ভুল থেকে শিখতে হবে এবং ভ্রমণসংক্রান্ত কাজের নানা দিক নিয়ে আগ্রহ থাকতে হবে।

মাসিক আয়

 দৈনিক চুক্তিতে ট্রাভেল গাইডরা সাধারণত প্রতিদিন ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় করেন।  আবার ভালো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ট্রাভেল গাইডরা দৈনিক ১০০ মার্কিন ডলার চুক্তিতে কাজ করে থাকেন। তবে ট্রাভেল গাইডের মাসিক বেতন সাধারণত বারো থেকে আঠার হাজার টাকার ভেতরে হয়ে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রথম ছয় মাসের জন্য একটি মাসিক সম্মানী নির্দিষ্ট থাকে। ট্রাভেল গাইড হিসেবে ছয় মাস পূর্ণ করলে মাসিক সম্মানী বাড়ানো হয়।

ট্রাভেল গাইডের ক্যারিয়ার

ট্রাভেল গাইড থেকে পদোন্নতির ঘটনা বেশ বিরল যেহেতু এটি একটি নতুন শিল্প। তবে পদোন্নতির উদাহরণ যে একেবারেই নেই তা নয়। ট্রাভেল গাইড তার কৌশল ও সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে সহকারী ট্রাভেল ম্যানেজার এবং পরবর্তীতে ট্রাভেল ম্যানেজার পদে উন্নীত হতে পারেন। আবার অভিজ্ঞতা লাভের পর অনেক ট্রাভেল গাইড নিজেই ট্রাভেল এজেন্সি খুলে ফেলেন।

ট্রাভেল গাইড হিসেবে কাজের জন্য প্রয়োজন বন্ধত্বপূর্ণ মনোভাব, বিনয় এবং ঘুরে বেড়ানোর স্পৃহা। তবেই এই পেশায় সফল হওয়া সম্ভব।

ফিচার ছবি- webindia123.com

Written by Sadman Sakib

ছাপা ও প্রকাশনার ব্যবসা থেকে আয় করুন

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত