সফল ভ্রমণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের আট শর্ত

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “মহাবিশ্বে মহাকাল-মাঝে আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে”। একাকী ভ্রমণে রোমানঞ্চ আছে তা অস্বীকার করা যায় না. আপনাকে খুঁজে পেতে মানুষ প্রকৃতির নিকট যায়। অনেক সময় শুধুমাত্র যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গেও বেরিয়ে পরে প্রকৃতির সৌন্দর্য আস্বাদন করতে। তবে দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হোক না কেন, কারো একার পক্ষে সকল বিষয় সামলে ওঠা সম্ভব নয়। ভ্রমণকে আনন্দদায়ক এবং চিন্তামুক্ত করতে নানা জায়গায় গড়ে উঠেছে নানা পর্যটন সেবা সংস্থা। এই সংস্থাগুলোকে ইংরেজিতে ট্যুর অপারেটর বলে।

ট্যুর অপারেটর আপনার ভ্রমণকে করবে আনন্দময়; Image Source: turismo.ninja

পর্যটন খাতে ভূমিকা রাখছে পর্যটন সেবা সংস্থাগুলো। ট্যুর অপারেটর কোনো একজন ব্যক্তি নিজেই হতে পারেন কিংবা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কাজে নিয়োজিত থাকতে পারেন। ট্যুর অপারেটরের মূল কাজ পর্যটকদের ভ্রমণ বিষয়ে নানা সেবা দেয়া। নিজ দেশে যেমন ট্যুর অপারেটরের সাহায্য দ্বারা ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যায় তেমনি বিদেশেও ট্যুর অপারেটরের সাহায্য নিয়ে ভ্রমণকে সহজ করা যায়। এতে করে পর্যটকদের অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ভোগান্তি পোহাতে হয় না।

ট্যুর অপারেটর ভ্রমণে সহায়ক সকল উপাদানগুলোকে একত্র করে একটি প্যাকেজ তৈরি করে। এই প্যাকেজে পর্যটক কোন হোটেলে অবস্থান করবেন, তাদের ভ্রমণটি কয়দিনের হবে এবং নির্ধারিত দিনের মধ্যে কোন কোন স্থানে ভ্রমণ করতে পারবেন, পরিবহনব্যবস্থাটি কেমন হবে, এমনকি ভ্রমণের দিনগুলোতে তাদের খাদ্য তালিকায় কি কি থাকবে তাও নির্ধারিত থাকে। নির্ধারিত প্যাকেজে ভ্রমণকারীর সকল বিষয়ের প্রতি অপারেটরকে নজর রাখতে হয়।

মূলত পর্যটন সেবাদানকারী সংস্থাগুলো ভ্রমণ সহায়ক উপাদান সমূহ সাপ্লায়ার তথা সরবরাহকারীর নিকট হতে ক্রয় করে থাকে এবং সেগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে নিজস্ব ব্র্যান্ডিং করে প্যাকেজ তৈরি করে।

পর্যটন সেক্টরে ট্যুর অপারেটরদের ভূমিকা অত্যাধিক। ট্যুর অপারেটরের কাজগুলো এক নজরে দেখে নেয়া যাক:

  • ভ্রমণকারীর আবাসস্থলের ব্যবস্থা করা
  • হোটেল, পরিবহন এবং গাইড এর সাথে যোগাযোগ করা
  • আগমন এবং প্রস্থানের ব্যবস্থা করা
  • ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করা
  • ভ্রমণকারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
  • ভ্রমণ স্থানের বিপণন ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া
  • প্যাকেজের মোট খরচ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা দেওয়া
      ভ্রমণ সংসশ্লিষ্ট উপাদানগুলোর আয়োজন করে ট্যুর অপারেটর; Image Source: didim.guide

পর্যটন সেবাদানকারী সংস্থাগুলো উল্লেখিত কাজ ঠিকমতো করে থাকলেও সকলেই যে সফল হবে এমনটি নয়। এ খাতে রয়েছে তুমুল প্রতিযোগিতা। যারা ভোক্তাদের সকল চাহিদা পূরণ করে, শুধু সেই কোম্পানিগুলো এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। এছাড়া সময়ের সাথে সাথে মানুষের আকর্ষণ বদলায়, চাহিদার ধরন বদলায়। অপারেটিং কোম্পানিগুলোকে তাই নিজেদের আপডেট রাখতে হবে, ভোক্তা তাদের কাছ থেকে ঠিক কি চাচ্ছে তাও তাদের বুঝে নিতে হবে. ফলে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপক এবং কর্মী।

সকল প্রতিষ্ঠানই সফল হতে চায় তবে ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কৌশলী হতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কোন দিক দিয়ে এগিয়ে আছে তাও লক্ষ্য করতে হবে। সাধারনত সফল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নতির ধারা বজায় রাখতে আটটি নিয়ম মেনে চলে। সফলতার এ আটটি মন্ত্র নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১. মালিক/ব্যবস্থাপকের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ

প্রতিষ্ঠানের মালিক অথবা নিয়োজিত ব্যবস্থাপক ব্যবসা সম্প্রসারণে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করে থাকে, কর্মীদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে ভ্রমণব্যবস্থা সম্পর্কে উচ্চপর্যায়ে পর্যন্ত সতর্ক থাকে। তারা একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেয় এবং তা অনুযায়ী কাজ করে এবং তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নজরদারিতে রাখে। প্যাকেজ কে চমকপ্রদ করার জন্য আলাদা একটি শাখা থাকে, যাদের কাজ প্যাকেজকে আরো আকর্ষণীয়ভাবে পরিকল্পনা করা। তবে এই শাখাটির কার্য নির্ধারণ এবং প্রবর্তনের দায়িত্ব ব্যবস্থাপকের।

২. গ্রাহকদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা

সফল পর্যটন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ থাকে শুধুমাত্র সে সকল গ্রাহকদের প্রতি, যাদের কাছ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। এটিই মূলত তাদের বাণিজ্যিক রণনীতি। আদর্শ গ্রাহকের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তারা অবগত। ফলে খুব সহজেই তারা আদর্শ গ্রাহকদের বেশি নিতে পারে। গ্রাহকদের ‘চাওয়া’-‘না চাওয়া’গুলো সম্পর্কেও তারা সচেতন এবং এর ভিত্তিতে ভ্রমণ পরিকল্পনা করে থাকে।

৩. আকর্ষণীয় এবং ব্যয়বহুল প্যাকেজ তৈরি

সফল প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমূল্যের ভ্রমণ সামগ্রী নির্বাচনে কার্পণ্য করেনা, যেহুতু তাদের মূল লক্ষ্য গ্রাহকদের সেবাদান করে লাভবান হওয়া। কেননা ভ্রমণকারী যত সমৃদ্ধশালি হবেন তাদের চাহিদা হবে ততো উঁচুদরের। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাই বারেবারে প্রদত্ত সেবার মান উন্নত করতে হয়। সবচেয়ে উন্নত সেবা প্রদান করলে প্যাকেজের জন্য উচ্চমূল্য হাকতেও সমস্যা নেই। ভ্রমণকারী তা নির্দ্বিধায় মেনে নেয়।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা গ্রাহকদের জন্য বৈচিত্রপূর্ণ বিনোদনের ব্যবস্থা করে থাকে যা অনেক সময় গ্রাহকদের ভাবতে বাধ্য করে যে তারা শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটিকে বেছে নিবে কিনা।

৪. চমকপ্রদ বিপণন কৌশল

সাধারণত সে সকল গ্রাহকদের থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ করা যায যারা পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। কেননা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চুক্তি করার ফলে লভ্যাংশ ভাগ হয়ে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী করতে তাই নিজস্ব ওয়েবসাইট অথবা ই-মেইল থাকা চাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও বিপণন প্রচারের মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

ওয়েবসাইট থাকার ফলে যোগাযোগ সহজ হয়; Image Source: 10x.travel

৫. গ্রাহকের চাহিদা পূরণ  

সকল মানুষেরই ব্যতিক্রমী জিনিসের প্রতি আগ্রহ থাকে। মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখে সফল প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা করে। খুব সাদামাটা পরিকল্পনার মধ্যেও রোমাঞ্চকর ভ্রমণের আয়োজন করে দেয়। কিছু নির্দিষ্ট কর্মী এই লক্ষ্যে তারা তৈরি করে নেয়, যারা গ্রাহকদের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করবে এবং আস্থা যোগাবে।

৬. গ্রাহকই বাণিজ্য প্রসারণের উৎস

প্রতিষ্ঠানগুলো জানে যে গ্রাহককে যদি মানসম্মত সেবা প্রদান করা হয় তবে এতে তাদের ব্যবসারই লাভ। কেননা গ্রাহকেরা ভবিষ্যতে তাদের হয়ে সুপারিশ করতে পারে। ফলে এই ধারায় তারা আরও গ্রাহক পেয়ে থাকে এবং ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটে। গ্রাহককে খুশি করতে তাই তারা নানা উপহার প্রদান করে থাকে, অফারও দেয়া হয়।

৭. না-বলার উপকারিতা

পর্যটন ব্যবসা ক্রমে বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পরিচিতি বাড়াতে অনেক ভ্রমণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হয়ে থাকে। সফল প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা বিজ্ঞাপনের সহায়তা নিতে অপছন্দ করে। উপরন্তু ব্যবসা প্রসারে তার নিজস্ব ওয়েবসাইট খরচ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিজ্ঞাপন সংস্থার মুখরোচক প্রস্তাবগুলো তারা তাই নির্দ্বিধায় বাতিল করে দেয়। ফলে অতিরিক্ত খরচ বেঁচে যায়।

৮. প্রভাববিস্তারকারী সংস্থাগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন

আদর্শ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে তারা অন্যান্য সংস্থার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কেননা সমাজের অন্যান্য সংস্থাগুলোর সাহায্য না পেলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। এরকম কিছু সংস্থা যার উপর কোনো ভ্রমণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্ভরশীল: দর্শনার্থী তথ্যকেন্দ্র, আঞ্চলিক বিপণন সংস্থা, পর্যটনশিল্প কাউন্সিল, মিডিয়া হাউস এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ ।

কর্মীদের অমায়িক ব্যবহার গ্রাহকদের তুষ্ট করে; Image Source: soapboxmedia.com

পর্যটন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরকে অনুকরণ না করে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে উন্নত এবং বৈচিত্র্যময় করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে পারে। কর্মীদের অমায়িক ব্যবহার এবং সুশৃংখল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিশ্লেষকদের মতে সফল অপারেটর হতে হলে এরকম কিছু নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক।

ফিচার ছবি- howtostartanllc.com

Written by Lameesha Rahman

বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনী ব্যবসায়ী